Home 20 মতামত 20 ঢাকার জলজট ও পানিবন্দি মানুষ

ঢাকার জলজট ও পানিবন্দি মানুষ

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকার নিম্নাঞ্চলে বিশেষ করে ডিএনডি বাঁধের ভিতরে মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। অতিবৃষ্টি হলেই ঢাকার বর্ধিত এলাকাগুলো পানিমগ্ন হয়। এমনকি অভিজাত গুলশান ও বারিধারায়ও দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। মিডিয়া কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন মানুষের দুর্ভোগের ছবি তুলতে। ছবি সত্য কথা বলে। ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও অবহেলার কথা তুলে ধরেন তারা। বেশিরভাগ সময়ই রিকশা উল্টে যায় পানিতে ও ময়লায় একাকার অর্ধ ডুবন্ত যাত্রীকে দেখানো হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের ড্রেনগুলো কিভাবে বন্ধ হলো, কতটুকু ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনও টিকে আছে, সেগুলো অকেজো হওয়ার পিছনে অর্ধ ডুবন্ত ব্যক্তির কোনো ভূমিকা আছে কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় খুব কমই প্রশ্ন তোলা হয়।
কী পরিমাণ বর্জ্য আমরা যত্রতত্র এবং সরাসরি ড্রেনে ফেলছি তার হিসেব কে করবেন? ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, ঢাকার ড্রেনে পাওয়া যায় না এমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই।  মৃত মানুষ, গরু, ফ্রিজ, মোবাইল, ভ্যাট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বা বাদ পড়া কোনো আইটেমই বাদ নেই। সীমিত সামর্থ্য, সেকেলে প্রযুক্তি এবং অদক্ষ দাস শ্রেণির (জীবনমানের বিবেচনায়) অপর্যাপ্ত জনবল নিয়ে শত চেষ্টা করেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব নয়। ধরা যাক, আমাদের বর্তমানে যতটুকু ড্রেনেজ ব্যবস্থা অবশিষ্ট আছে তার শতভাগ কাজ করছে। তাহলেও কি ঢাকার জলজট তাত্ক্ষণিকভাবে নিরসন সম্ভব? দিন-রাতে মিলে যদি ১৩৩ মিলি লিটার বৃষ্টি হয়, তাহলে তাত্ক্ষণিকভাবে এই পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা শহরের অধিকাংশ রাস্তাকেই ড্রেনে রূপান্তর করতে হবে। একদিনে এতো বৃষ্টি হলে পৃথিবীর কোনো শহরেই তাত্ক্ষণিকভাবে এতো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। নিউইয়র্ক শহরে যখন বরফ পড়ে তখন পাঁচ সাত দিন পর্যন্ত কেউ ঘর থেকে বের হতে পারে না। কোনো কোনো রাস্তায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত বরফে ঢাকা থাকে। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। বিমানবন্দর এবং স্টেশনে আটকা পড়ে হাজার হাজার যাত্রী। নিউইয়র্কে বরফ পড়ে, ঢাকায় পানি জমে এই যা ব্যতিক্রম। ভোগান্তি প্রায় একই রকম, শুধু ময়লা-আবর্জনা নেই। তবে এই দুর্ভোগ মোকাবিলায় আমেরিকানরা ধৈর্য দেখায়। ঘরেই বসে থাকে আর আমরা রিকশা বা অন্যের কাঁধে চড়ে স্কুল-কলেজে রওনা হই। বাচ্চাদের নিয়ে টানাটানি করি। আমি তো মনে করি জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিলে স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া উচিত। যা পরবর্তী সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ক্লাস নিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে। উন্নত দেশে বরফে ঢেকে গেলে এমনটিই করা হয়।
জলাবদ্ধতার জন্য অতিবৃষ্টিকে কারণ হিসেবে দেখা হলেও এর জন্য দায়ী মানুষ। ডিএনডি বাঁধের ভিতরে জলাবদ্ধতার জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে দায়ী করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেউ কেউ বাঁধের ভিতরে মাছ চাষকে দায়ী করছেন। যারা মাছ চাষ করছেন তারা অবৈধভাবে বৈধ কাজটিই করছে। পুরো দোষ মাছ চাষি বা মাছের নয়। যেখানে পানি আর মাছ থাকার কথা ছিল সেখানে গিয়ে মানুষ থাকলে যা হওয়ার তাই হবে। আসলে হয়েছেও তাই। ষাটের দশকে যখন ডিএনডি প্রজেক্ট তৈরি করা হয় তখন সেচ প্রকল্প হিসেবে সেটা তৈরি করা হয়। প্রকল্প এলাকায় মাছ ও সবজি চাষ করে ঢাকাবাসীর প্রোটিন ও ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করাই এর লক্ষ্য ছিল। ওখানে হাইরাইজ ভবনাদি তৈরি করে বসতি স্থাপনের কথা ছিল না। বর্তমানে পাম্প দিয়ে সেচ করে পানি নিষ্কাশনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চলছে। এক রাতে যদি অঝোরধারায় বৃষ্টি হয় তারপর যদি আর দশ দিন বৃষ্টি না হয়, তাহলেই কেবল বর্তমানে চালু পাম্প দিয়ে এক রাত্রির বৃষ্টির পানি দশ দিনে নিষ্কাশন সম্ভব। বর্ষাকালে প্রতিদিনেই বৃষ্টি হয়। এ হিসেবে পানি নিষ্কাশনে পাম্পের সংখ্যা ও ক্ষমতা দশগুণ বাড়ালেও ডিএনডি বাঁধের  ভিতরের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। বাঁধের ভিতরের ইউনিয়নগুলোই নাকি এতোদিন বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দিত। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউনিয়ন কাউন্সিলের এ ধরনের ভবন নির্মাণে অনুমোদনের সক্ষমতা ও ক্ষমতা ছিল কিনা? বর্তমানে ইউনিয়নগুলোকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতার সমস্যা দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখছি না। আরো অনেক দিন ডিএনডি বাঁধের ভিতরে হাওরে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে থাকতে হবে বলে মনে হচ্ছে। ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণেও হাওরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। এখনই অবশিষ্ট খালগুলোতে ছোট নৌকা চলাচলের উপযোগী করে তোলা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। বৃষ্টি আর পানির সাথে তাল রেখেই অবকাঠামো ও বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
আমরা যেমন ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে মানুষকে সতর্ক করি, তেমনি ঢাকায় সম্ভাব্য  জলাবদ্ধতার পূর্বাভাস দিতে হবে যাতে মালামালের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যায়। টানা বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে অন্তত শিশুদের স্কুলগুলো বন্ধ রাখা যেতে পারে। সিটি করপোরেশনের পানি ব্যবস্থাপনার থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগী হতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশি দক্ষতা অর্জন করা গেলে পয়ঃব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ওয়াসার উপর না চাপিয়ে কিছু কৃতিত্ব সিটি করপোরেশনও পেতে পারে। বর্জ্যমুক্ত নগরীই কেবল এই সীমিত অকেজো ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ‘জলজট’কে কিছুটা হলেও কমাবে। আরেকটা বিষয়, আগাম সতর্ক হওয়া দরকার। সেটা হচ্ছে এ বছর বন্যার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। ঢাকার চারপাশের নদীর পানি স্ফীত হলে জলাবদ্ধতা আরো বাড়বে বৈ কমবে না। দীর্ঘমেয়াদে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ঢাকার আশেপাশের নদ-নদী দখলমুক্ত করা বা খনন করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এ বছরের উদভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের জরুরি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। মানুষের সাময়িক দুর্ভোগ কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হবে সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার কাজ।
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

About dhaka

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ইউএনওর মোবাইল নম্বর ক্লোন করে চাঁদা দাবি

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল কাশেম মুহাম্মদ শাহীনের মোবাইল নম্বর ক্লোন করে চাঁদা ...

ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা বহিষ্কার

বানারীপাড়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন হোসেন মোল্লাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার ...

পাবিপ্রবিতে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, হল ভাঙচুর

হলের আসন বরাদ্দে আধিপত্য বিস্তারে শাখা ছাত্রলীগের দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ...

মশা মারার ৩৬ কোটি টাকা জলে

বছরের পুরোটা সময়েই মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ থাকে নগরবাসী। মশা-বাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মশক ...

ডিএমপির ট্রাফিক অভিযানে তিন হাজারের অধিক মামলা

ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তিন হাজারেরও অধিক মামলা ...