Home 20 মতামত 20 ভুল বিচার করিনি কখনই

ভুল বিচার করিনি কখনই

আল্লাহ আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, এদেশের প্রথম নারী বিচারক। তবে আমার বিচারক হওয়ার পেছনে আমার মরহুম আব্বার ইচ্ছা ও আমার আম্মার প্রেরণা বড় ভূমিকা রেখেছে। আমার আব্বা আমাদের ৫ ভাই-বোনকে ছোট রেখেই মারা যান। আব্বার ইচ্ছা ছিল তার সন্তানদের মধ্যে একজন ব্যারিষ্টার হবে। কিন্তু আমার মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি তার কোন সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে ব্যারিষ্টারি পড়ানোর। আমার মনে হয়েছিল আমি আইন পড়লে আমার আব্বার ইচ্ছা খানিকটা পূরণ হবে। আমি ল’ কলেজে ভর্তি হলাম আম্মার উত্সাহে। মফস্বল শহরের ল’ কলেজ। রাত্রে ক্লাস হয়। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত ৯ টার বেশি হয়ে যায়। ঐ সময় মফস্বল শহরে অল্প বয়সের কোন অবিবাহিত মেয়ে রাত ৯ টায় একা রিক্সায় করে বাড়ি ফিরবে-এটা খুব একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু আমার মায়ের সাহস ও প্রেরনায় আমি আইন পড়া চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। ল’ পাশ করে ময়মনসিংহ জেলার প্রথম নারী আইনজীবি হিসেবে আমি আইন পেশায়ও যোগ দেই আমার অসীম সাহসী মায়ের প্রেরণায়।

ময়মনসিংহের জজ কোর্টে আমি প্রথম যেদিন আইনজীবি হিসাবে যোগদান করি সেদিনটির কথা আমার হূদয়ে গেঁথে আছে। ঐ দিনই বোধহয় আমার মনের কোণায় ইচ্ছাটা উঁকি দিয়েছিল – ‘আমি কি জজ হতে পারি না? ’ কিন্তু জানলাম আমি জজ হতে পারি না। বাংলাদেশে নারীরা জজ হতে পারে না। কিন্তু আমার মনের জজ হওয়ার প্রবল ইচ্ছাটা হয়তো জগত্কর্তাকে ছুঁয়েছিল। আমি ওকালতি শুরু করার বছর দেড়েকের মধ্যেই বাংলাদেশ সরকার নারীদের বিচারক না হওয়ার বিধানটি তুলে নেয়।

১৯৭৪ সালে সরকার বিচারক (মুন্সেফ) পদে নিয়োগের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করে কাগজে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলো। আমি আবেদন করলাম। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে যায় কোন সাড়া পাইনা। ইতিমধ্যে আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি স্বামীর সাথে তাঁর কর্মস্থল খুলনায় চলে যাই। খুলনায় যাওয়ার ১৪ দিন পরেই খবর যায় আমার মা খুব অসুস্থ। মার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমি সাথে সাথেই ময়মনসিংহ চলে আসি। আম্মা একটু সুস্থ হলে, আমি আম্মার বাসায় ঝুলানো লেটারবক্স খুলে আমার অ্যাডমিট কার্ড পাই। কার্ডটি টি খুলে দেখলাম আর মাত্র ৬/৭ দিন পরেই আমার বি, সি, এস, লিখিত পরীক্ষা, ১০০০ মার্কস্ এর। ভয় পেলাম-এত অল্প সময়ের মধ্যে প্রিপারেশন নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া কি করে সম্ভব! আমার মা আমাকে সাহস জোগালেন। আমরা ঐ ব্যাচে মোট ১৮ জন নিয়োগ পেয়েছিলাম। আমি তৃতীয় হয়েছিলাম। তবে আমার ওপরের দুই জনের একজন চাকুরিতে যোগ না দেওয়ায় এবং অন্য জন অল্প কিছুদিন পরেই চাকুরি ছেড়ে দেওয়ায় আমি আমার ব্যাচের 1st man হিসাবেই ছিলাম। আমার আম্মা যদি ঐ সময় অসুস্থ হয়ে না পড়তেন তাহলে ঐ বিশেষ সময়টায়, বিয়ের মাত্র ১৫/২০ দিন পর, আমার খুলনা থেকে ঢাকায় আসা হতো না, বি, সি, এস, পরীক্ষাটা হয়তো দেওয়া হতো না-বিচারকও হওয়া হতো না। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ আমাকে বিচারক করবেন বলেই হয়তো আমার আম্মা ঐ সময়টায় অসুস্থ হয়েছিলেন।

দেশের প্রথম নারী বিচারক হয়ে আমি খুলনার জজশীপে মুন্সেফ হিসাবে যোগদান করি ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে। ঐ সময়টায় এটি একটি বেশ গুরুত্ব্বপূর্ণ খবর হিসাবে দেশের খবরের কাগজগুলোতে ছাপা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া দুরকমেরই হয়েছিল। কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছিলেন আবার অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন-‘নারী আবার বিচারক হতে পারে না কি-নারী আবার কী বিচার করবে?’ কর্মক্ষেত্রেও আমি এই দুরকমের আচরণই পেয়েছিলাম। অনেকের কাছ থেকে অবজ্ঞা পেলেও অনেকের কাছ থেকেই আমি খুবই ভাল আচরণ পেয়েছি, উত্সাহ পেয়েছি, সাহায্য পেয়েছি। ঐ উত্সাহ, সাহায্যটুকু না পেলে হয়তো আমার বিচারক হিসাবে টিকে থাকাই সম্ভব হতো না।

প্রথম নারী বিচারক হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাইনি – আল্লাহর কাছে তাই আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে হয়তো আজ বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ নারী বিচারক হতো না। বাংলাদেশের নারী বিচারকরা অনেক সময় অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু অসুবিধা-বিপদের সম্মুখীন হন যা দুর করার দায়িত্বে উর্ধবতন যে পুরুষ বিচারকরা আছেন – তাঁরা অনেক সময়ই সে অসুবিধা, বিপদ বুঝতেই পারেন না বা বুঝতে চানই না। নারী বিচারকদের সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ-সংকট ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার জন্যই মূলত আমি ১৯৯০ সনে আমার কিছু নারী সহকর্মীদের সহযোগিতায় গঠন করি বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন – যা এখন সারা বিশ্বের নারী বিচারকদের কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত সংগঠন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারী বিচারকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে Inteational Association of Women Judges (IAWJ) যার বর্তমান সদস্য সংখ্য প্রায় ৫০০০। বাংলাদেশ মহিলা জজ এসোসিয়েশন-Inteational Association of Women Judges এর জন্মলগ্ন থেকেই এই সংগঠনটির সদস্য।

আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর পরেই ন্যায় বিচারকের স্থান-যা সহীহ্ হাদিসে বর্ণিত আছে। জেনে বুঝে অবিচার করা বা অমনোযোগী হয়ে বা অবহেলা করে ভুল বিচার করা আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না। পক্ষাশ্রিত হয়ে বা কোন কারণে বা কারো দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে বিচার করা মহাপাপ। আমার আত্মতৃপ্তি-আমি জেনেবুঝে বা অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে বা পক্ষাশ্রিত বা প্রভাবান্বিত হয়ে ভুল বিচার, অন্যায় বিচার করিনি কখনই।

বিচারকদের সঠিক বিচার করার কাজে সহায়তা করার দায়িত্ব আইনজীবিদের। আইনজীবিদের সহায়তা ছাড়া একজন বিচারকের পক্ষে সঠিক বিচার করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। একজন বিচারক তাঁর জ্ঞান সমৃদ্ধ করেন আইনজীবীদের জ্ঞান থেকেই। বিজ্ঞ আইনজীবিরাই গড়ে তোলেন একজন দক্ষ বিচারক। আমার যেটুকু অর্জন তার সবটাই আইনজীবীদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞানের জন্যই।(গতকাল বৃহস্পতিবার অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দেয়া সংবর্ধনার জবাবে। সংক্ষেপিত)

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপিল বিভাগ, সুপ্রিম কোট

About Dhakar News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদন শুরু এপ্রিলে

ঢাকার নিউজ ডেস্কঃএপ্রিল মাসের ১ তারিখ থেকে গুচ্ছভুক্ত ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে বিশটি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও ...

বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলল হেলপার

ঢাকার নিউজ ডেস্কঃ ফের ভয়াবহ মানবিক বিকৃতির উদাহরণ দেখল বাংলাদেশ। নারী দিবসের কয়েকঘন্টা আগেই রাজধানীর ...

বিদেশ যেতে পারবেন না খালেদা জিয়া

ঢাকার নিউজ ডেস্কঃবিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা আরও ছয়মাসের জন্য স্থগিত করার সুপারিশ করেছে আইন ...

মুজিব আদর্শের সৈনিকেরা রাজপথ ভয় পায় না – ওবায়দুল কাদের

সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকার নিউজ ডেস্কঃ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তথা সড়ক পরিবহন ...

‘এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটাই অন্যায়!’ ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম

নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট করেন ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের জন্য দেশব্যাপী আলোচিত ...