Home 20 মতামত 20 ভাষার বিশুদ্ধতার কাহিনী

ভাষার বিশুদ্ধতার কাহিনী

অনেক বছর আগে Reader’s Digest-এ আইসল্যান্ডে পর্যটনের ওপর একটি লেখা পড়েছিলাম। আমি নিজে ভূবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় Mid-Atlantic Ridge-এর ঠিক ওপরে অবস্থিত, আগ্নেয়গিরি ভরা দ্বীপ দেশটির অনন্য ভূপ্রকৃতি সম্পর্কিত অনেক কিছুর সাথে পরিচয় মন্দ নয়। কিন্তু আইসল্যান্ডের প্রসঙ্গ উঠলেই আজো দেশটির ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে বরং আমার সবচেয়ে প্রথমে মনে পড়ে Reader’s Digest-এর লেখাটির শেষের দিকে লেখকের খুব মজার একটি মন্তব্য ‘আইসল্যান্ডীয়দের কাছে তাদের ভাষার সতীত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে আসা কেউ যেন কোনো বিদেশী শব্দ ফেলে না যায় সে দিকে তাদের সজাগ দৃষ্টি।’ লেখকের মন্তব্যটি আরিকভাবে কতটুকু সত্যি জানি না, তবে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সাথে সাথে পরিকল্পিতভাবে আরোপিত ভাষাতাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা যে দেশটিকে বিশ্বের দরবারে অনেকটা আত্মীয়শূন্য করে রাখছে, তা বলার অপো রাখে না।
ভাষার কথিত সতীত্বের ধারণাটি কোনো নতুন প্রবণতা নয়। মানুষের ইতিহাসে অনেক রকম মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিভিন্ন ভাষার বিশুদ্ধতা রা করার প্রচেষ্টাও কম হয়নি। এসব প্রচেষ্টার পরিধি ছিল বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ থেকে শুরু করে সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত আন্দোলন পর্যন্ত। তবে সার্বিক বিচারে কতটুকু সাফল্য অর্জিত হয়েছে তা নির্ণয় করতে গেলে বিশুদ্ধতার মানদণ্ডগুলোর দিকে তাকাতে হবে। উল্লেখযোগ্য মানদণ্ডগুলো হলো শব্দসম্ভার, উচ্চারণ-ঝেঁক্ষাঁক, বাক্যরীতি, বর্ণমালা ইত্যাদি। এর মধ্যে শব্দসম্ভার শুদ্ধকরণের উদাহরণগুলোই লণীয়ভাবে বেশি ঘটেছে, যেখানে ‘বিদেশী’ ভাষা থেকে ‘ধার করা’ শব্দ পরিহার করে সেগুলোর জায়গায় নতুন শব্দ উদ্ভাবন ও নির্মাণ কিংবা অব্যবহারে অতীতে হারিয়ে যাওয়া পুরনো শব্দ পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। ‘বিদেশী’ ও ‘ধার করা’ এ দু’টি দিকে একটু তাকালেই বিভিন্ন পরিশুদ্ধি আন্দোলনের পেছনে ক্রিয়াশীল প্রেরণার উৎসটি সহজেই বোঝা যায়। তা হলো জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা অন্য কোনো সামষ্টিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অতিরণশীলতা; যেখানে স্বজাতীয় বনাম বিজাতীয়, দেশী বনাম বিদেশী, একান্তই নিজস্ব বনাম ধারকৃতÑ এ রকম পরস্পরবিরোধী দ্বৈততার মাধ্যমে চলে বাঞ্ছিত শব্দের সংরণ বা পুনরাবিষ্কার ও লালন এবং ‘অবাঞ্ছিত’ শব্দের চিহ্নিতকরণ ও বর্জন।
বিশ্বজুড়ে অবিরাম ঘটমান গতিময় আদান-প্রদানে কতগুলো ভাষা স্বকীয়তার পুরোটাই হারিয়ে ফেলে, কতগুলো সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষ লাভ করে, আর অন্য কতগুলো আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলার ভয়ে রেশমের গুটির ভেতরে আটকে থাকে যেন ‘আপনাতে আপনি বিভোর’। এই তৃতীয় ধরনের রণশীলতার অবস্থান নিয়েছে আইসল্যান্ডিক ভাষা। বিভিন্ন রকমের অনুন্নত Pidgin বা Creole ভাষাগুলোর বেশির ভাগেরই জন্ম হয়েছে বাণিজ্যিক বা ঔপনিবেশিক প্রয়োজনে অপোকৃত উন্নত একাধিক ভাষার অনিয়ন্ত্রিত মিশ্রণের ফলে। এই মিশ্রণের লীলাভূমি মূল ভাষাগুলোর কেন্দ্রভূমি থেকে যত দূরে, ভাষাগুলো তত কম ‘দূষিত’ হয়। চীনের উপকূল অঞ্চলে ইংরেজি ও ম্যান্ডারিন/ক্যান্টনিজের অবাধ মিশ্রণে জন্ম নেয়া ‘পিজিন ইংরেজি’ চীনা বা ইংরেজি ভাষার ওপর কোনো রকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।
যেকোনো উন্নত ও বিবর্তিত ভাষায় প্রতিফলিত ইতিহাস, জীবনযাত্রা, জাতিসত্তা ও বিশ্ববীক্ষার অভিজ্ঞান সংরণের তাগিদে ভাষাটির ব্যবহারকারীদের প থেকে সীমিত পরিসরে রণশীল আচরণ স্বাভাবিক, কিছুটা কাক্সিক্ষতও বটে। তবে dominant ঐতিহ্য ও জীবনদর্শনকে উপো করে বিশেষ মতবাদের প্রভাবে উদ্ভাবিত ভাষাতাত্ত্বিক ‘সতীত্বের’ মানদণ্ডের ভিত্তিতে শব্দসম্ভারের ব্যাপক পরিবর্তন সব সময় সুফল বয়ে আনে না, বিশেষ করে যে শব্দসম্ভার গড়ে উঠেছিল শত শত বছর ধরে। শব্দসম্ভারের ভাষাতাত্ত্বিক শুদ্ধতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, যথাসম্ভব শুধু genetically closely related উৎস থেকে গৃহীত শব্দের ব্যবহার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হিন্দি ও উর্দুর মধ্যে হিন্দির ভাষাতাত্ত্বিক ‘সতীত্ব’ উর্দুর চেয়ে বেশি, কারণ দু’টি ভাষাই জন্মগতভাবে সংস্কৃত থেকে এলেও হিন্দিতে সংস্কৃত উৎস থেকে প্রাপ্ত শব্দের প্রাধান্য রয়েছে। আর উর্দুতে ফারসি ও সেমিটিক ভাষা পরিবারের আরবি থেকে আসা প্রচুর শব্দের উপস্থিতিতে সংস্কৃতের প্রভাব অনেকটা ুণœ হয়েছে। ভাষার ‘হারিয়ে যাওয়া সতীত্বের’ পুনরুদ্ধারকল্পে শব্দসম্ভারের ব্যাপক re-engineering হয়েছে অনেক ভাষাতেই। যেমনÑ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকে বাংলা ভাষায় তুর্কি জাতির ওপর কামাল আতাতুর্কের জাতিসত্তার দর্শন চাপিয়ে দেয়ার পর থেকে, উগ্র আরব জাতীয়তাবাদের প্রভাবে হাজার বছর ধরে নিত্যব্যবহৃত ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন অনেক শব্দের সেকুলারাইজেশন ইত্যাদি।
ভাষাতাত্ত্বিক সতীত্ব রার প্রচেষ্টা অনেক সময় একটি ভাষার অর্থপূর্ণ সমৃদ্ধি, নমনীয়তা, সার্বজনীনতার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সম্ভবত বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ভাষা ইংরেজি শব্দসম্পদের বিচারে চরম ‘অসতী’, কিন্তু ভাষাটি বাস্তবিকই সমৃদ্ধ। ইংরেজি জন্মগতভাবে জার্মানিক উপভাষাগোষ্ঠীর হলেও এর শব্দসম্ভার অতিমাত্রায় ল্যাটিন প্রভাবিত। ইংরেজি অভিধান থেকে ab-, ad-, de-, dis-, en-, ex-, in-, pre-, pro-, re-, sub-, super-, trans-, un- প্রভৃতি prefix, এবং age, -ance, -ary, -action, -ify, -ity, -ive, -ize, -ment, -sion প্রভৃতি suffix যুক্ত সব ল্যাটিনজাত শব্দ বাদ দিলে hand, leg, head, milk, fish, meat, bread, London জাতীয় শব্দ ছাড়া খুব কমই অবশিষ্ট থাকে। ইংরেজি ভাষা বাইরের থেকে শুধু দুই হাত ভরে নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ধার করা শব্দ থেকে আরো নতুন শব্দ বানিয়েছে। counsel I council দু’টি শব্দই ফরাসি থেকে ধার করা conseil থেকে বানানো, অথচ ফরাসিতে এই একটি শব্দই দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। অন্য দিকে আইসল্যান্ডিক ভাষা নিষ্কলুষ সতীত্বের অধিকারী হয়েও রীতিমতো দরিদ্র।
বাংলা ভাষায়ও দীর্ঘ দিন ধরে ভাষাতাত্ত্বিক সতীত্বের ভিত্তিতে শব্দসম্ভারের নীরব পরিশুদ্ধকরণ চলছে, যার সূচনা হয়েছিল উনিশ শতকের শুরুতে। তবে অতি সম্প্রতি এই প্রক্রিয়ার পালে যেন কোত্থেকে বেশ জোর বাতাস লেগেছে। আকিদা, আমল, আমানত, ইন্তেকাল, এবাদত, আলেম, জাহেল, ফিতনা, হেকমত, মরহুম, দাফন, ইনসাফ প্রভৃতি একসময়ে বহুলব্যবহৃত শব্দ প্রায় অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে অনেকের কাছে। এর ফলে অনেক ইসলামি পরিভাষার ধারণাও হয়ে যাচ্ছে অস্বচ্ছ। মরহুম আর প্রয়াত এক নয়, তেমনিভাবে এক নয় দাফন ও শেষকৃত্য কিংবা ইবাদত ও উপাসনা।
দুই বছর আগে ‘জয় শব্দ সঞ্চয়িতা বাংলা অভিধান’ (সম্পাদনায় : এস কে আহমদ, প্রকাশক : শাহীদ হাসান তরফদার, জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা নামে প্রায় পাঁচ শ’ পৃষ্ঠার বইটি বাংলাদেশফেরত এক বন্ধুর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলাম। পাতা উল্টিয়ে অভিধানটির মান নির্ণয় করতে গিয়ে থ হয়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহ, খোদা, নবী, মুসলিম/মুসলমান, ইসলাম, ঈদ, ঈমান, নামাজ/নামায, জাকাত/যাকাত, হজ এবং এ রকম আরো অনেক শব্দ যেগুলো হাজার বছর ধরে এ দেশের মুসলিমদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; সেগুলো অভিধানটিতে অনুপস্থিত। আমার খোঁজা অসংখ্য শব্দের মধ্যে পেয়েছি মাত্র রসুল ও রোজা। জানি না এ দু’টি শব্দ কিভাবে পার পেয়ে গেল। এতগুলো শব্দ যে ভুলে বাদ যায়নি, তা বলার অপো রাখে না। এ অভিধানটি কী উদ্দেশ্যে বা কার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তা বুঝতে পারছি না। প্রসঙ্গত, কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ‘সংসদ বাঙ্গালা অভিধানে’ এ দুই বর্ণের অধীনে ইত্তিলা, ইদ/ঈদ, ইদ্দৎ, ইনকার, ইনকিলাব, ইনসান, ইনসাফ, ইনাম, ইন্তেকাল, ইন্তেজার, ইন্তিজাম, ইফতার, ইবনে, ইমাম, ইমারত, ইয়াদ, ইয়ার, ইরশাদ, ইরসাল, ইরাদা, ইলাকা/এলাকা, ইলাহি, ইল্লৎ, ইশতিহার, ইসলাম, ইস্তফা, ইস্তামাল আরবি-ফারসি থেকে আসা শব্দগুলো আছে, যার একটাও বাংলাদেশের আলোচ্য অভিধানটিতে দেখা যায় না।
কলকাতায় নয়, ঢাকাতেই আজ প্রকাশিত হচ্ছে ভাষাতাত্ত্বিক সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ কথিত ‘বিশুদ্ধতম’ বাংলা ভাষার অভিধান। আর বহু দূরে আটলান্টিকে ভাষার সতীত্বের গর্বে উদ্ধত আইসল্যান্ডবাসীর মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে।

লেখক পরিচিতি : আমেরিকা প্রবাসী; ১৯৯০ সাল থেকে বিদেশে আছেন। ভূপদার্থবিদ্যায় পিএইচডি অর্জনের পর সে দেশেই থিতু হন। বর্তমানে আমেরিকার বিখ্যাত তেল কোম্পানি কনোকোফিলিপসে জিওফিজিসিস্ট (ভূপদার্থবিদ) হিসেবে চাকরিরত। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টন শহরে সপরিবারে বাস করেন। আরবি, ইংরেজি, ফরাসি, ফারসি, রাশিয়ান প্রভৃতি ভাষায় দখল রয়েছে।

About Dhakar News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদন শুরু এপ্রিলে

ঢাকার নিউজ ডেস্কঃএপ্রিল মাসের ১ তারিখ থেকে গুচ্ছভুক্ত ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে বিশটি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও ...

বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলল হেলপার

ঢাকার নিউজ ডেস্কঃ ফের ভয়াবহ মানবিক বিকৃতির উদাহরণ দেখল বাংলাদেশ। নারী দিবসের কয়েকঘন্টা আগেই রাজধানীর ...

বিদেশ যেতে পারবেন না খালেদা জিয়া

ঢাকার নিউজ ডেস্কঃবিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা আরও ছয়মাসের জন্য স্থগিত করার সুপারিশ করেছে আইন ...

মুজিব আদর্শের সৈনিকেরা রাজপথ ভয় পায় না – ওবায়দুল কাদের

সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকার নিউজ ডেস্কঃ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তথা সড়ক পরিবহন ...

‘এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটাই অন্যায়!’ ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম

নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট করেন ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের জন্য দেশব্যাপী আলোচিত ...